পোস্টগুলি

ফ্লয়েডেডকথন লেবেল থাকা পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে

এলোকথন (আষাঢ়া ২৫:১)

ছবি
আমি জানি, এইসব এলোকথন একদিন ছাই হয়ে উড়ে যাবে, আর সেই ছাই থেকে জন্মাবে আরো এক রাশ ছাই। ছাইয়ের ধুলা, আমার প্রতিটা দীর্ঘনিশ্বাসের ধুলা, চোখের অজান্তে ভেতরে ঢুকে যাওয়া ধুলা—সকল ধুলা উড়ে বেড়াবে ধুলাময় এই শহরের আকাশে। দেহহীন মাথাগুলো গোলটেবিলের দশপাশে জড় হয়ে ভাবতে বসবে এ থেকে মুক্তি কোথায়, অন্যদিকে মাথাহীন দেহগুলো ধুলারে মেরে মেরে কাদা করে দিতে থাকবে, প্যাঁচপেঁচে সেই কাদায় ডুবে দেহরা চিৎকার করবে, প্যাঁচপেঁচে সেই কাদায় না-ডুবে মাথারা চিৎকার করবে, ফলে নিশ্চিতভাবেই তারা কাদা-সমস্যায় আক্রান্ত হবে।  কেননা এইসব এলোকথন একদিন ছাই হয়ে উড়ে যাবে, আর কে না জানে, ছাই থেকে কেবল ফিনিক্সই জন্মায় না, কখনো জন্মায় কেবল আরেক রাশ ছাই।  তখন সেক্রেটারিয়েটে কার্পেট বিছানো অফিসে বসে দেহহীন মাথার মনে পড়বে, বস্তুত ছাই থেকে ফিনিক্স জন্মায় না, ফিনিক্সই খানিকক্ষণের জন্যে ছাই হয়ে যায়। এবং ক্রমান্বয়ে সে মাথা তুলে উঁকি দেয়, পাখা তুলে ঝাপটা দেয়, একসময় উড়ে যায়, পেছনে পড়ে থাকে তার ছাইটুকু।  সেক্রেটারিয়েটের সুগন্ধ-কফিতে চুমুকের পর চুমুক দিয়ে দেহহীন মাথা হিসাব মিলাতে থাকবে, কিন্তু ধুলোময় শহরে উজ্জ্বল ...

এলোকথন (মৃগশিরা ২৪:১)

ছবি
শীতটুকু নামেমাত্র হলেও, এইসব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে। আমি ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারি না, কারণ কাক-না-ডাকা ভোরে উঠে যখন কাক-ডাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে আমাকে একটা দিন পার করতে হয়, এবং এরপর আরামবাগের বিপরীতে প্রচণ্ড চায়ের তৃষ্ণা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, এবং এরও পর, আমাকে যথাক্রমে ও বিপরীতক্রমে হাঁটতে ও দাঁড়াতে হয়—তখন আমি ব্যাখ্যা করতে পারি না—কেন এইসব শীতের রাতে (কিংবা সন্ধ্যায়) আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে। ভাগ্যে তিনি ছিলেন। নয়তো হয়তো জোর গলায় এটুকুও বলতে পারতাম না যে, আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে। বড়জোর ‘ক্যাঙ্কা লাগতিসে গে বা’ বলেই থেমে যেতে হত, কিংবা আরেকটু স্পষ্ট করে বললে—আমাকে থমকে যেতে হত, প্রচণ্ড শক্তিতে নিজেকে প্রকাশ করার চেষ্টা করতাম, আমি চিৎকার করতে চাইতাম, এবং শেষপর্যন্ত, ‘ক্যাঙ্কা জানি লাগতিসে’-তে এসেই থমকে যেতাম। এই মৃত্যুর কারণ কি কেবল এই যে, আমরা ক্লান্তিটুকু, আমাদের বিষণ্নতাটুকু রাখার জন্য একটা ছায়া খুঁজে বেড়াই? কিংবা, ছায়ার আশ্রয়টুকুতে আসার ঠিক পরমুহূর্তেই কি এক ধরনের বিষণ্নতাবোধ আমাদের আক্রান্ত করে? আমাদের ক্লান্ত, ক্লান্ত করে? আমি ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারি না, কা...

এলোকথন (ভাদ্রপদ ২)

ছবি
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মানুষের সাথে আকাশের একটা সম্পর্ক আছে। সারা দুপুর বসার ঘরে কাজ করছিলাম। যেই ঘরের জানালাটা বহুকাল আগে মরে গেছে, খালা হয়তো মাসে একবার সবাইকে মনে করানোর চেষ্টা করে, জানালা মরে নাই, খালার অসামান্য চেষ্টার পর ফাঁকফোঁকর দিয়ে সামান্য একটু আলো ঢোকে, সেই আলোতে ঘর আলো হয় না, বরং অন্ধকারের কথাটাই নতুন করে মনে পড়ে যায়, খালা জোর গলায় দাবি করে, দু হাত তুলে চিৎকার করে, জানালা মরে নাই, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি না, যে জানালা দিয়ে অন্ধকার আসে, সেটা আমার কাছে মরে গেছে, সেই বছর উনিশ আগে, সেই উনিশ বছর আগে যখন আপুর সাথে এই বাসায় ঢুকেছিলাম, তখন থেকেই… এইসব জানালা, ওরাও তো প্রতীকী বটে, কেন বসার ঘরের জানালাটাই অকালে মরে যাবে, কেনই বা আমার ঘরের জানালাটা অকালে বেঁচে থাকবে, জ্যান্ত জানালা, মৃত জানালা, সবাই মিলে আমার চিন্তাকে আক্রমণ করবে, বারবার করে বলবে, ওরাও নাকি প্রতীক, কী যেন ছাই, মেটাফোর, জানালাগুলো একেকটা মেটাফোর, শিকলদেবীর পূজার বেদী ভাঙতে আলোটুকু তো লাগবেই, ও-ঘরে দেবী জন্ম নেবে, আমার ঘরে এসে অপঘাতে মরে যাবে… কাজেই, চৌকো জানালার বাইরে যে চৌকো আকাশ, সেই আকাশের সাথে আমাদের সম্পর্ক...

সালভাদরের ভাঙতি

ছবি
[এই লেখাটা সুরভী আন্টির জন্য নিষিদ্ধ। দেখুন আন্টিই, আজকাল আপনার মত থুড়থুড়ে শতবর্ষী বুড়োদের জন্যও লেখা নিষিদ্ধ করা শুরু করেছি। দয়া করে এটা পড়বেন না, আমি সিরিয়াস। আপনাকে টনসিলের ঝুঁকি নিয়ে আইসক্রিম খাওয়াতে রাজি আছি আমি, এই যে লিখে দিলাম।] অন্ধ প্যাঁচা আর স্থবির ব্যাঙ ছাড়াও সুররিয়েলিজম হয় বটে। প্রায় দুদিন হল, আমার পৃথিবীটা সুররিয়েলিস্টিক হয়ে যেতে শুরু করেছে। পদ্মর নানাভাইকে মাটি দিয়ে আসার পর থেকেই এই অনুভূতিটা হচ্ছে। ওনাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম না, কাজেই খুব একটা মন খারাপ করার সুযোগও ছিল না। সেকারণেই কিনা কে জানে, অনুভূতিটা ‘মন খারাপ’ না হয়ে ‘সুররিয়েলিস্টিক’ হয়ে যাচ্ছে। এই যে লিখছি, মাথার ওপর যে ফ্যানটা ঘুরছে, সেই ফ্যানের শব্দেও একটা পরাবাস্তব টান পাওয়া যাচ্ছে। আমার একটা সমস্যা আছে, কেউ মারা গেলে আমি তার চেহারা দেখতে পারি না। বছর দেড়েক আগে ফুপী মারা গেল। মাটি দেয়ার আগে সবাই শেষবারের মত ফুপীকে দেখতে গেল। আমি গেলাম না। দীর্ঘ তিনমাস কোমায় থাকলে কি মানুষের চেহারা পাল্টে যায়? ভাইয়ার কাছে শুনেছি, মারা যাবার আগে ফুপীর চেহারা অনেক পাল্টে গিয়েছিল। বড় হওয়ার পর ভাইয়াকে ক...

এলোকথন (শ্রবণা ৬)

ছবি
আজ কি পূর্ণিমা? আজ সম্ভবত পূর্ণিমা। তটিনীটা জেগে থাকলে জিজ্ঞেস করা যেতো। কোনদিন কৃষ্ণা দ্বাদশী কিংবা কবে শুক্লপক্ষ শুরু হচ্ছে—এইসব হিসাব মেয়েটা চোখের পলকে করে দিতে পারে। অবশ্য মার্ফির ল থেকে সহজেই বলা যায়, রাতটা পেরোলেই যেহেতু আমার ডাটাকম পরীক্ষা—আজ পূর্ণিমা হতে বাধ্য। শুধু তাই না, আজকের পূর্ণিমাটা বেশ অনেকখানি সুন্দর হতেও বাধ্য। আম্মুর ঘর দিয়ে যেই আকাশটা দেখলাম, তাতে আর ছাদে যাওয়ার সাহস হল না। পরীক্ষার আগেরদিন মাথা এলোমেলো করতে নেই। অবশ্য, আরেকটু এলোমেলো হলেই বা কী এসে যায়। ওয়ার্ডস আর ফ্লোয়িং আউট লাইক এন্ডলেস রেইন ইনটু আ পেইপার কাপ। মাথাটা আরেকটু এলোমেলো হলে কি খুব বেশি কিছু এসে যাবে? মনে হয় না। আশ্রয়, আশ্রয়। আজ সন্ধ্যা থেকে শুরু করে রাত দুটো পর্যন্ত যা যা ঘটেছে—তা বোধহয় অতীতের সব অভিজ্ঞতাকেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অভিজ্ঞতা নতুনই বটে। একুশ বছরের জীবনের ঝুলিতে অনেককিছুই জমা হয়ে গেল। যা যা জীবনে দেখবো বলে স্বপ্নেও কল্পনা করিনি—তাও দেখতে হল। বাইরের খোলসটা অবশ্য একেবারেই স্বাভাবিক আছে। আম্মু-আব্বুর সাথে রাতের খাবার খাচ্ছি। আব্বু গল্প করছে। শুনছি। রিয়াকে বকা দিচ্ছ...

অবোধ

ছবি
এক. আমাদের পাশের বাসায় গতকাল একজন মারা গেছেন। দীর্ঘ উনিশ বছর ধরে একই এলাকায় আছি তো, অনেকগুলো জন্ম-মৃত্যু দেখতে হয়েছে আমাকে। আমার কেন যেন একটাও বিশ্বাস হয় না। এই ধরো, আপুর ঘর থেকে কোণাকুণি যে বাসাটা দেখা যায়—সেখানে একটা ছেলে থাকতো। সিক্স-সেভেনে পড়ে হয়তোবা। সারাদিন দৌঁড়াতো। আর ওর ছোট বোনটার সাথে দুষ্টুমি করতো। ওদের খিলখিল হাসি আমাদের বাসা থেকেও শোনা যেত। মন খারাপ থাকলে প্রায়ই আপুর ঘরের জানালা দিয়ে আকাশ দেখতাম, তখন ওদের দিকেও চোখ পড়ত। (উল্লেখ্য, আমার জানালা দিয়ে একটুখানি আকাশ দেখা যায়। আপুর জানালা দিয়ে দেখা যায় অনেকখানি। ছোটবেলায় আপুর ঘরের প্রতি আমার আলাদা একটা ভালোবাসা ছিল। সেটা জানালার জন্যও হতে পারে, আপুর আদরের জন্যও হতে পারে—কে জানে।) একদিন পাশের বাসার সেই ছেলেটা মারা গেল। হঠাৎ একিউট লিউকেমিয়া ধরা পড়ল, ঠিকঠাক চিকিৎসা শুরু করার আগেই সব শেষ। ব্যাপারটা আমি জানলাম কলেজে যাওয়ার সময়। সকালবেলা বাসা থেকে বের হয়েছি, এমন সময় হাউজিং-এর মাইকে ঘোষণা করা হল, ছেলেটা মারা গেছে। ওর ছোট বোনটা প্রায়ই বারান্দার জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতো। চুপ করে। সেও দেখত দেখতে বড় হয়ে গেল। ছেলেটার বয়...

চৈত্রের কাফন

ছবি
[তেরোই মে পর্যন্ত এই লেখাটা ময়মনসিংহ, আরামবাগ এবং জিগাতলার জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল।] একদিক দিয়ে দেখলে অবশ্য, বৃশ্চিকের মৃত্যুটা অবশ্যম্ভাবী ছিল। ওকে শুধু মরতে হত না, ওকে মরতেই হত। লিগ্যাসি তাই বলে। তবু, মরে যাওয়া মানে সবকিছুর শেষ তো, ওটা কষ্ট দেয়। মৃত্যুর শঙ্কাটা প্রথমে আমিই করেছিলাম। এই ধরনের লিগ্যাসি প্রায় প্রফেসির মত। ছাই, স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে কিনা কে জানে, কবে প্রথম কথাটা বলেছিলাম—ঠিক মনে নেই। সেটা শিল্পকলাতেও হতে পারে, বইমেলার সময় মুক্তমঞ্চেও হতে পারে, আবার সাদাসিধে ফোনালাপের সময়েও হতে পারে। তবে বলেছিলাম, ঠিক মনে আছে। ও ছিল আমার মতই। কিছুটা খ্যাপা, একটু আনমনা, কখনো দ্রোহী—এমনই। অনেকগুলো আমরা মিলে যখন একটা সত্তা ছিলাম, সেই সত্তার একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল বৃশ্চিক। আজ থেকে প্রায় দুইশো বছর আগে, যে সময়টায় আমি জন্ম নেই, তখন মৃত্যুতে তেমন একটা বিশ্বাস করতাম না। অন্তত বৃশ্চিকের মত উজ্জ্বল মণ্ডলীর ক্ষেত্রে তো কখনই না। মনেপ্রাণে বিশ্বাস হত, ওটা অনন্তকাল ধরে জ্বলবে! তবে…একটা খটকা ছিল বটে। লিগ্যাসি কি তবে টিকবে না? না টেকার মতও তো কিছু ঘটেনি! প্রফেসি ভেঙে ফেলার...