পোস্টগুলি

আগুনের পরশমণি

ছবি
আমার ধারণা, পৃথিবীর প্রতিটা মহৎ কাজের জন্ম হয় গভীর দুঃখ থেকে। বছরদুয়েক আগে এই শহরটা ভুতুড়ে একটা সময় পার করছিল। রাজনীতির সবচেয়ে অন্ধকার অংশটুকু সেই সময় প্রথমবারের মত আমাকে সামনাসামনি দেখতে হয়েছে। মাত্রই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি তখন। ক্লাস শুরু হয়নি, কাজেই হাতে কাজকর্ম নেই। প্রচুর গান শুনতাম। আর দিনরাত ছবি আঁকতাম। প্রায় প্রতিদিনই মেসালদের সাথে আড্ডা দিতাম। আর প্রায় প্রতিদিনই এই শহরের মানুষেরা পুড়ে মরত। মানুষ বড় সস্তা ছিল তখন, চাইলেই একসাথে দু-দশজনকে পুড়িয়ে মারা যেত। আমার বয়সী একটা ছেলে একদিন তার বাবার ট্রাকে বসে ছিল। ঘুমাচ্ছিল। সেই বাসে আগুন দেয়া হল, ছেলেটার পঁচানব্বই ভাগ পুড়ে শেষ। সেই অবস্থায় সে দুদিন বাঁচলোও। কী কষ্ট! পোড়ার যে কষ্ট—সেটা যার কখনো হয়নি তার জন্য বোঝা কঠিন। (এই প্রসঙ্গে আরেকটা কথা বলে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে। এই ব্যাপারটা কিছুটা লিখেছিলেন নোবেলজয়ী স্ভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ, তাঁর ভয়েসেস ফ্রম চেরনোবিল বইটাতে। চেরনোবিল দুর্ঘটনার পর আশেপাশের অনেক লোক রেডিয়েশনে পুড়ে গিয়েছিল, মানুষগুলো কীভাবে হাসপাতালে ধীরে ধীরে মরে গেল—সেই ভয়ংকর কষ্টের বর্ণনা বইটাতে আছে। আমি যখন দিনাজপুরের স...

Eleanor Rigby

ছবি
আজকের রাতটা তাৎপর্যপূর্ণ একটা রাত। শেষ রাতের বৃষ্টিতে আমার শহরটা ভেসে যাচ্ছে। অথচ গতকাল ঠিক এই সময়ে বৃষ্টির কণামাত্রও ছিল না। আকাশজুড়ে খুব হালকা একটা আলো ছিল। কৃষ্ণা পঞ্চমীর চাঁদ কি অতক্ষণ থাকে? জানি না, কিন্তু একটা যে আলো ছিল—সেটা তো মিথ্যে না, আর সেই আলোয় আলাদা করে মেঘগুলো দেখা যাচ্ছিল। এত পবিত্র একটা দৃশ্য! গতকাল রাতে ঘুমোতে গিয়েছিলাম একটা মুগ্ধতা নিয়ে। কারণ কিছুক্ষণ আগে আমি একজন অসাধারণ মানুষকে আবিষ্কার করেছি। এমনিই নেটে ঘোরাঘুরি করছিলাম, হঠাৎ করেই আমার মনে হল, সে অদ্ভুত ভালো একজন মানুষ। চেনাজানা মানুষের ভেতর থেকে যখন অসাধারণ একজন বের হয়ে আসে—এর চেয়ে অদ্ভুত সুন্দর ব্যাপার আর কী হতে পারে? নাকি আমাদের ম্যাথ অলিম্পিয়াড করা ছেলেমেয়েগুলো—ওরা কি এমনিতেই এত চমৎকার একেকজন মানুষ হয়? কে জানে! কিন্তু আজকের রাতটা গতকালকেও ছাড়িয়ে যাবে দেখছি। শুরু হয়েছিল খুবই সাধারণভাবে। কাজ করছিলাম, এমন সময় তটিনী ফোন দিল। মানুষজনের যে বকা খাওয়ার এত আগ্রহ থাকতে পারে—সেটা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। টাকা খরচ করে কেন মেয়েটা বকা খায়, কে জানে। কিন্তু কোন কোন দিন একটু অন্যরকম হতে বাধ্য। আম...

ফারহার সন্ধ্যা

ছবি
৬ জুন, ২০২৩ আজকের সন্ধ্যেটা কি একটু বেশি নীল ছিল? হয়তোবা। সারাদিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টি হওয়ার পর সন্ধ্যেটা একটু বেশি সুন্দর দেখাবে—এটা অস্বাভাবিক কিছু না। শেষবিকেলে নিজের ঘরে ঢুকে নিজেই মুগ্ধ হলাম। খোলা জানালা দিয়ে নীল আলো আসছে, সারা ঘর ভেসে যাচ্ছে সেই আলোয়। ধবধবে বিছানার চাদর বাতাসে উড়ছে—এত সুন্দর একটা দৃশ্য! অবশ্য মন খারাপ হতেও খুব বেশি সময় লাগলো না। এমন সুন্দর একটা সন্ধ্যা, অথচ ভাইয়া দেখবে না। ভাইয়া যেদিন মারা যায়, সেই সন্ধ্যেটা আরও গাঢ় নীল ছিল। ময়মনসিংহ শহরটা ভেসে যাচ্ছিল বৃষ্টিতে। আর আমি চুপ করে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মাথা ঝিমঝিম করছিল, বেশ বুঝতে পারছিলাম জ্বর আসছে। তবু জানালা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছিল না। আমি তখন ক্লাস টেনে। আর ভাইয়া পড়ত বুয়েটে থার্ড ইয়ারে। ভার্সিটিতে ওঠার পর প্রথম যেদিন ময়মনসিংহ ছেড়ে যায় ভাইয়া, আমাকে হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘এই যে যাচ্ছি, বছর শেষ হওয়ার আগে আর আসবো না।’ তাই শুনে আমার সে কী কান্না! ভাইয়া বরাবরের মতই আমাকে পাত্তা না দিয়ে বের হয়ে গেল। আমি রাগ করে সেদিন ভাত খেলাম না। রাতে সে ফোন দিলো, আমি কথাও বললাম না। ওমা, সপ্তাহখানেক পরেই এক দ...

আশ্রয়

এটা খুবই আশ্চর্য, কেন কেবলমাত্র মেলানকোলিয়ায় ডুবে গেলেই ছবি আঁকতে ইচ্ছে করে। পৃথিবীর মানুষগুলো রুদ্ধশ্বাসে দৌঁড়াচ্ছে, এই সময়ে ফ্লয়েডেড অবস্থায় আরেকটা ছবি আঁকতে বসার অর্থ—সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখানো। যে বুড়ো আঙুল দেখায়, সে বোকা। আর বোকারা সবসময়ই একা। রবির ভাষায়, সবার মাঝে আমি ফিরি একেলা। গিলমোরের ভাষায়, আর্থ বাউন্ড মিসফিট। ঠিক এই মুহূর্তে এসে মানুষ কিছু একটা করে ফেলে। কেউ সিদ্ধার্থের মত গৃহত্যাগী হয়। কেউ জন লেননের মত অবিশ্বাস্য একটা গানের দল বানিয়ে ফেলে। কেউ জীবনের প্রথমবারের মত একটা ছবি আঁকতে পারে। শেষ পর্যন্ত সবাই জীবনের অর্থটুকু খোঁজে। সিদ্ধার্থ খুঁজেছিলেন সন্ন্যাসের মধ্য দিয়ে। জন লেনন খুঁজেছিলেন তাঁর লেখা অসাধারণ গানগুলোর মধ্য দিয়ে। কে জানে, হয়তো এর ভেতর দিয়েই চূড়ান্ত পরিত্রাণ আসে, তাই মানুষ অর্থটুকু খুঁজে বেড়ায়। আর খুঁজে বেড়ায় আশ্রয়। দিনশেষে প্রতিটা মানুষই আশ্রয় খোঁজে। সাদাসিধে একজন মানুষ। দিনশেষে দুটো কথা। কেবল অকাজের কথা। এই কথায় শাহবাগের মিছিলের প্রসঙ্গ আসবে না। এই কথায় ইলেকট্রন-প্রোটনের গুরুতর রহস্য যাচাই করা হবে না। চুলোয় যাক ভয়েজার স্পেসশিপ, আকাশে দুবার উল্ট...

ক্ষুদ্র পুরাতন প্রশ্ন

ছবি
জর্জ হ্যারিসনের একটা গান ছিল, হোয়াট আই ফিল, আই ক্যান্ট সেই। (জর্জ ছেলেটা না, বেড়ে গাইতো। একদিন ওকে নিয়ে লেখার ইচ্ছা আছে।) আজকাল এই অনুভূতিটা প্রায়শই হচ্ছে আমার। হোয়াট আই ফিল, আই ক্যান্ট সেই। এই মাস দেড়েক আগেও, এক রাতে আকিব ছেলেটা বিশাল বিশাল মেসেজ দিচ্ছিল। সে কী ভাষা, একেকটা মেসেজের মধ্যে নেলসন ম্যান্ডেলা থেকে শুরু করে বাংলাদেশে ইতিহাসে সমাজতন্ত্রের ভূমিকা পর্যন্ত সবকিছুই লিখে ফেলছে। আমি পড়ে শেষ করতে পারি না, একটা শেষ করার আগেই আরেকটা বিশাল মেসেজ চলে আসে। (আজকাল ছেলেটা বুর্জোয়াদের স্বর্গভূমির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লিস্টেড হয়েছে দেখে বিপ্লবের স্বর্ণক্ষেত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঘোরাফেরা করা মানুষদের পাত্তা দেয় না। তাতে খুব সমস্যা হয় না অবশ্য, কারণ আরামবাগ কিংবা ময়মনসিংহ হয়ে তার খবর আমার কাছে আসে।) যাকগে, সে রাতে আকিবের দুঃখভরা কথাগুলো শুনে আমার আবারও একই অনুভূতি হচ্ছিল। জীবনের অর্থ কী? আমাদের কাজগুলো শেষপর্যন্ত কোথায় পূর্ণতা পাচ্ছে? কিংবা, আদৌ কি পাচ্ছে? প্রশ্নগুলো কি আরজ আলী সাহেবের মত হয়ে যাচ্ছে? হা হা! হয়তোবা। কিন্তু শেষপর্যন্ত এই প্রশ্নগুলোই আমাদেরকে সবচেয়ে বেশি ...

অবোধ

ছবি
এক. আমাদের পাশের বাসায় গতকাল একজন মারা গেছেন। দীর্ঘ উনিশ বছর ধরে একই এলাকায় আছি তো, অনেকগুলো জন্ম-মৃত্যু দেখতে হয়েছে আমাকে। আমার কেন যেন একটাও বিশ্বাস হয় না। এই ধরো, আপুর ঘর থেকে কোণাকুণি যে বাসাটা দেখা যায়—সেখানে একটা ছেলে থাকতো। সিক্স-সেভেনে পড়ে হয়তোবা। সারাদিন দৌঁড়াতো। আর ওর ছোট বোনটার সাথে দুষ্টুমি করতো। ওদের খিলখিল হাসি আমাদের বাসা থেকেও শোনা যেত। মন খারাপ থাকলে প্রায়ই আপুর ঘরের জানালা দিয়ে আকাশ দেখতাম, তখন ওদের দিকেও চোখ পড়ত। (উল্লেখ্য, আমার জানালা দিয়ে একটুখানি আকাশ দেখা যায়। আপুর জানালা দিয়ে দেখা যায় অনেকখানি। ছোটবেলায় আপুর ঘরের প্রতি আমার আলাদা একটা ভালোবাসা ছিল। সেটা জানালার জন্যও হতে পারে, আপুর আদরের জন্যও হতে পারে—কে জানে।) একদিন পাশের বাসার সেই ছেলেটা মারা গেল। হঠাৎ একিউট লিউকেমিয়া ধরা পড়ল, ঠিকঠাক চিকিৎসা শুরু করার আগেই সব শেষ। ব্যাপারটা আমি জানলাম কলেজে যাওয়ার সময়। সকালবেলা বাসা থেকে বের হয়েছি, এমন সময় হাউজিং-এর মাইকে ঘোষণা করা হল, ছেলেটা মারা গেছে। ওর ছোট বোনটা প্রায়ই বারান্দার জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতো। চুপ করে। সেও দেখত দেখতে বড় হয়ে গেল। ছেলেটার বয়...

বীত

ছবি
অনেকদিন পর নানুকে স্বপ্নে দেখলাম। প্রায় সাড়ে ছয় বছর আগে যেই মানুষটা মারা গেছে—সে যখন স্বপ্নে আসে তখন ব্যাপারটা খুব স্বাভাবিক মনে হয়। আমার কাছেও মনে হল। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নানুর সাথে গল্প করলাম। ঘুম ভাঙার কিছুক্ষণ পর মনে পড়ল, নানু আসলে নেই। নানাভাই চলে গিয়েছিল এক বেলার নোটিশে। দুপুরে স্ট্রোক করল, বিকালের দিকেই সব শেষ। নানাভাই মারা যাওয়ার পর কে যেন নানুকে বলছিল, 'বুড়োটা তো ফাঁকি দিয়ে চলে গেল, তুই আবার ওভাবে যাস না!' (নানুবাড়ির ওদিকে কাছের মানুষজনকে তুই করে বলার রীতি ছিল। আম্মুও প্রায়ই আদর করে নানুকে তুই বলে ডাকতো। নানাভাইকে অবশ্য আপনি বলেই ডাকতো—যদ্দূর মনে পড়ছে।) নানুকে ফাঁকি দিয়ে যেতে নিষেধ করা হল, নানুই উল্টো বড় ফাঁকি দিল। এক রাতে খেয়েদেয়ে ঘুমাতে গেল, সকালে আর উঠলো না। রাতেরবেলা আমরা কেউ না কেউ নানুর সাথে ঘুমাতাম। যদি হঠাৎ কিছু দরকার হয়। সাধারণত সুপ্তিই ঘুমাত নানুর সাথে। সে রাতেও ঘুমিয়েছিল। বেচারা তখন অনেক ছোট তো, সকালে উঠে কিছু বুঝতে পারেনি। সে দেখে, নানু ঘুম থেকে উঠছে না, হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। তার মনে হল, নানুর খুব ঠাণ্ডা লাগছে। গায়ে একটা কাঁথা টেনে দিয়ে সে...

এলোকথন (বিশাখা ১)

ছবি
[ আবারও নিষিদ্ধ! আরামবাগ-জিগাতলা-ময়মনসিংহের জন্য। পরীক্ষা শেষ কর আগে। গাধা।] ইদানিং কী হয়েছে জানি না, যা মনে আসছে তাই লিখে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে। যা ইচ্ছে তাই লিখে ফেলা কোন কাজের কথা না, আনিসুল হকের মত একজন মানুষ এই করতে করতেই বখে গেলেন। অবশ্য, আমি যাচ্ছেতাই লিখলে বড় কোন সমস্যা হওয়ার কথা না। আনিসুল হকের লেখার অর্থ বাংলা সাহিত্য। হেলাল হাফিজের লেখার অর্থ বাংলা কাব্য। ওনারা যা মনে আসে তাই ছাপিয়ে দিলে এই ভাষার গায়ে কালিমা লাগে। আমি নিতান্ত খেলো একজন মানুষ​—এই যুক্তিতে আমি যাচ্ছেতাই লিখে যাই। এবং ইফরীতের ভাষায়, "নোবেলের সেসব লেখা তার ব্লগে ছাপাও হয়ে যায়"। আচ্ছা হোক। তাতে খুব বেশি ক্ষতি নেই বুঝিবা। খুব, খুব অদ্ভুত, একটু আগে বাসার সামনের রাস্তাটা ধরে হাঁটছিলাম। কিছুদূর আগানোর পরেই মাথা এলোমেলো হয়ে গেল​—সারা রাস্তা জুড়ে খুব চেনা একটা ঘ্রাণ। ঘ্রাণটা চেনা, কারণ আমি প্রতিবার দাদুবাড়ি গেলে এই গন্ধটা পাই। পুরো ঠাকুরগাঁও শহরজুড়েই আমি আলাদা আলাদাভাবে এটা পাই। পোড়াকাঠের ঘ্রাণ থেকে শুরু করে মুদির দোকানের ঘ্রাণ — সবকিছুই আমাকে সেই ফেলে আসা শহরটার কথা মনে করিয়ে দিল। এবং কয়ে...

তোমরা

ছবি
জানালা দিয়ে বৃষ্টির ঝাপটা আসছে। শুধু ঝাপটা আসছে বললে ভুল বলা হবে, বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা জানালা দিয়ে ঢুকছে। ইচ্ছে করেই জানালাটা খুলে রেখেছি, কারণ খানিক্ষণ আগে আমার মাথায় দেবব্রত বিশ্বাস ঢুকে গেছে। ভাঙা রেকর্ডের মত একটা কথা মাথায় বাজছে। সকাল থেকে টানা জাভা দিয়ে একটা ফাইল এক্সপ্লোরার বানানোর চেষ্টা করছিলাম। দীর্ঘক্ষণ কোডের দিকে তাকিয়ে মাথাটা এখন আর কাজ করছে না। অথবা, মাথাটা আর চাপ নিতে চাচ্ছে না—সেই বেচারারও তো একটা সহ্যসীমা আছে। আমার পুরো চিন্তাভাবনায় এখন অন্যকিছু নেচে বেড়াচ্ছে। জানি না কেন, প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে বারবার চোখে পানি আসছে। এই কিছুদিন আগেও নওশীনকে বলছিলাম, একুশ বছরের একটা মানুষ কথায় কথায় ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলতে পারে না। কাজেই কত এক ঘন্টা ধরে যা ঘটছে, তাতে আমার বিব্রত হওয়া উচিত ছিল। আমার বিব্রত লাগছে না। ভালো লাগছে কেন যেন। সপ্তাহখানেক আগে একজন বলছিল, সে প্রবল বৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়ে ভেউ ভেউ করে কাঁদবে। আমাকেও তার পাশে দাঁড়িয়ে ভেউ ভেউ করতে হবে। সেই মুহূর্তে ব্যাপারটা অনেক হাস্যকর মনে হয়েছিল, ঝাড়ি দিয়েছিলাম মেয়েটাকে। আজ রাত নয়টা সাতান্ন মিনিটে প্রস্তাবটা আর হাস্যকর লাগছে ...

যাকে আমি মেইল দেই না

ছবি
​​প্রিয় "ইয়ে", সম্বোধনটা যথেষ্ট গুরুতর হয়ে গেছে রে। "ইয়ে" বলে কাউকে ডাকাটা খুবই ইয়ে দেখায়। কিন্তু তোর নামটা না লিখে কী যে লেখা যায়—সেটা ভেবে পেলাম না। বল তো কী লেখা যায়? ​​ আমার সম্বোধনের মত তোর অভিযোগটাও গুরুতর, আমি আর মেইল দেই না। অভিযোগটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই, কারণ সেটা একশোভাগ সত্যি। মেইল দেয়ার প্রয়োজন ফুরিয়েছে না? আমরা আবারও সস্তা হয়ে যাওয়া শুরু করেছি। তুই একটুখানি, আর আমি অনেকখানি। আমি কিন্তু পারলে ফেসবুকটা বন্ধ করে দিতাম। আবারও মেইল-মেইল আর ফোন-ফোন খেলতাম। মাসকয়েক আগের ঐ দিনগুলো কী চমৎকার ছিল, জানিস? হাতে​​গোণা পাঁচ-সাতজনের সাথেই কথা হত কেবল। কিন্তু যাদের সাথে হত, একদম একশোভাগ খাঁটি কথা হত। মানে, অদ্ভুত ব্যাপারস্যাপার ছিল​​—​মনে কর, ​​অর্ণবের সাথে আমার কোন যোগাযোগ নেই, এবং নেই মানে একেবারেই নেই, শূন্য। আর পদ্মর সাথে যোগাযোগ আছে—সেটার ​অর্থ হল, ​কয়েকদিন পরপর​ বাসায়​ বসে​ আড্ডা, আর কয়েকবার করে ফোনে​ চেঁচামেচি।  প​দ্মদের বাসায় কতদিন যাই না জানিস? আবার ফেসবুকটা বন্ধ করে দিতে পারলে ভালো হত কিন্তু। সবার কাছ থেকে পাওয়া ছোট ছোট চ্যাটের পর...

এলোকথন (ফিরে আসা চৌদ্দ)

ছবি
“Lay her a-hold, a-hold! Set her two courses: off to sea again, lay her off.” মুশকিল, এই সময়ের বৃষ্টিটা বড় মুশকিলে ফেলে দিচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টিটা হয়েই যাচ্ছে। এই একটু আগে বিষম বেগে বৃষ্টি নামলো—পুরো পৃথিবীটা ভাসিয়ে নিয়ে যাবে যেন। আমার জন্য মুশকিল, কারণ বৃষ্টি হলে পড়াশোনা করতে ইচ্ছে হয় না। খুব, খুবই ইচ্ছে হয় লিখতে। অথচ একগাদা পড়া জমে আছে। নিলয়কে (আমাদের ক্লাসের নিলয়) কথা দিয়েছি, ঠিকমত পড়াশোনা করব। আগের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। চৌদ্দ সালে ঠিক এভাবেই বৃষ্টি হত। আমরা এইচএসসি দেই সে বছর। প্রত্যেকটা কথা যেন স্পষ্ট মনে পড়ে যাচ্ছে। ঠিক আমাদের প্র্যাকটিকাল পরীক্ষাটা শেষ হল, আর সেই বছরের বৃষ্টিটাও শুরু হল। এইচএসসির পরের সময়টুকু মানুষ একটা ঘোরের মধ্যে থাকে। এই যে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটা রেস, এই রেসটা মানুষকে অবিশ্বাস্য একটা ঘোরের জগতে নিয়ে যায়। আমরা সেই ঘোরের মধ্যে বাস করতাম। আহা! সেই দিনগুলো! মানে, কল্পনার বাইরে একেকটা দিন গেছে। তখন ছবিটবি আঁকতাম না, কিছুই করতাম না। শুধু পড়তাম, মন ভালো থাকলে পড়তাম, আর মন খারাপ থাকলে…হুম, তখনও পড়তাম। আর বৃষ্টি হত বাইরে। জানা...

এলোকথন (বিরলের ডায়েরি)

ছবি
[এলোকথন অর্থ কী? সম্ভবত, এলোমেলো কথাবার্তা। এই কথাগুলো কেবল নিজের ডায়েরিতেই লেখা উচিত, এর বাইরে না। তবে ভরসা এই যে, যেসব লেখা আমার নিজের জন্য, সেখানে আরও কয়েকজন মানুষের দাবি আছে।] ১৫ এপ্রিল, শনিবার বিকাল ৫:৩৭ ঘুমাইনি। ভাগ্যিস ঘুমাইনি! অথচ জেগে থাকার তেমন কোন কারণ ছিল না। সারারাত ট্রেনে এসে এবং সারাদিন ক্যাম্পে চেঁচামেচির পর একটা কথাই সত্য মনে হয়—ঘুম। সেই সাথে আজকে দিনাজপুরের আবহাওয়াটাও ঘুম ঘুম, চারিদিকে কেমন শান্তির একটা ভাব। সকালে অবশ্য ভালোই গরম ছিল। দুপুরে খাবার পর থেকে সবকিছু কেমন যেন দ্রুত পাল্টে যেতে শুরু করল। আমরা যখন সায়েন্টিফিক পেপারের লেকচারটা দিতে শুরু করেছি, আকাশটা একটু একটু করে কালো হচ্ছে। ঝড় আসার ঠিক আগে আগে বিদ্যুৎ চলে গেল, আর চারপাশ এমনই অন্ধকার হয়ে গেল, ক্লাসরুমে আর কাউকেই দেখা যায় না। খারাপ লাগছিল না ওভাবে ক্লাস নিতে। কারই বা খারাপ লাগে ওসব মুহূর্তে? ওদিকে বৃষ্টির ঝাপটা আসছে, আমি একবার করে ক্লাসের বাইরে যাচ্ছি, ফিরে এসে আবিরের কাছ থেকে ফ্লোর নিচ্ছি, তখন আবার আবির ক্লাসের বাইরে যাচ্ছে! Alternating lecture. পরে ঝড়টা যখন মোটামুটি প্রলয়ের র...

পেন্সিল

ছবি
এক. অরিত্র যখন তার ডিপার্টমেন্টের সিঁড়িতে এসে দাঁড়াল, তখন বিকেল প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। শেষ বিকেলে কার্জন হলে অসংখ্য ছেলেমেয়ে থাকার কথা। সত্যি বলতে কী, ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ তারিখে একটু বেশিই থাকার কথা। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রির সামনের রাস্তাটা পুরো ফাঁকা। অরিত্র একটু ভুরু কুঁচকে তাকাল। পৃথিবীর প্রচলিত নিয়মকানুনে তার কোন আস্থা নেই, কিন্তু নিয়মের বাইরে কিছু দেখলে একটু অস্বস্তি লাগে। সোমলতা এখনো আসেনি, সেটা নিয়েও একটু অস্বস্তি লাগছে। পকেট থেকে ফোনটা বের করে সময় দেখা যায়, কিন্তু বের করতে ইচ্ছে করছে না। সময়টা না দেখেও বলা যায়, এতক্ষণে সোমলতার চলে আসার কথা। সোমলতার সাথে দেখা হওয়ার আগের কিছুক্ষণ অরিত্র একটু অস্থিরতায় ভোগে। এই অস্থিরতা কীসের জন্য, সে নিজেও জানে না। যেই মানুষটার সাথে প্রতিদিন দু-তিনবার দেখা হয়, না চাইলেও জহিরের ক্যান্টিনে, পুকুরপাড়ে, কিংবা কার্জনের গেটে যার সাথে দেখা হতে বাধ্য, সেই মানুষটাকে ফোন দিয়ে ডেকে আনলে কেন এত অস্থির লাগে, অরিত্র ব্যাখ্যা করতে পারে না। ডিপার্টমেন্টের দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে অরিত্র সামনে তাকাল, এবং হঠাৎ করেই মুগ্ধ হল! এতক্ষণ এই দৃ...