পোস্টগুলি

ছাদ

ছবি
এক. ফারহাদের বাসাটা তিনতলা। একতলাটা গত দু মাস ধরে ফাঁকা পড়ে আছে। আর দোতলায় গত বিশ বছর ধরে এক বুড়ো পড়ে আছে। রিটায়ার্ড বুড়ো। বিশ বছর আগে লোকটা যখন এই বাড়িতে উঠেছিল, তখনও নাকি এমনই বুড়ো-বুড়ো চেহারা ছিল। একহাতে ছেঁড়া সুটকেস, আর অন্য হাতে একটা ভাঙা গীটার নিয়ে উঠে এসেছিল এই বাড়িতে। তবে আশ্চর্য এই যে, গত বিশ বছরে কেউ এই বুড়োকে গীটার বাজাতে শোনেনি। বুড়ো চিৎকার করে বাড়িওয়ালার সাথে ঝগড়া করেছে, এলাকার ছোট বাচ্চাদের আদর করে চকলেট খাইয়েছে, রমজান মাসে সারারাত মসজিদে জেগে কেঁদেছে, শেষবিকেলে বাসার চারপাশে পায়চারী করেছে, কিন্তু কখনই তার গীটারটা বাজায়নি। অথবা, কেউ তাকে বাজাতে শোনেনি। ফারহার আম্মুর ধারণা, বুড়ো গীটার বাজাতে পারে না। কোথাও কুড়িয়ে পেয়েছে—তাই নিয়ে চলে এসেছে। চালচুলোহীন বুড়ো! ফারহার কেন যেন এটা বিশ্বাস হয় না। বুড়ো বড্ড গরীব—এটা ঠিক অবশ্য। তাই বলে খামোখা একটা ভাঙা গীটার নিয়ে বিশ বছর পার করে দিবে? সে মাঝেমধ্যেই ভাবে, একদিন সাহস করে বুড়োকে জিজ্ঞেস করবে, উনি গীটার বাজান না কেন। সাহস হয়ে ওঠে না। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় কখনো বুড়োর সাথে দেখা হয়ে যায়। বুড়ো গম্ভীর মুখে হুংকা...

এলোকথন (শ্রবণা ৪)

ছবি
আমার মনে হচ্ছে আমরা কিছু একটা হারাচ্ছি। আমি, তুমি, সে—আমরা সবাই। আজ থেকে প্রায় বাইশ বছর আগে বিটিভি অসাধারণ একটা অনুষ্ঠান প্রচার করেছিল। নাম ‘জলসা’। উপস্থাপক ছিলেন আনিসুল হক। মেয়র সাহেব যে একসময় উপস্থাপনা করতেন—আমি জানতাম না। আর অতিথিদের মধ্যে ছিলেন…এহ্‌ম, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, শ্রদ্ধেয় মুস্তাফা মনোয়ার, খান আতাউর রহমান, কলিম শরাফী, নীলুফার ইয়াসমিন, সোল্‌স, মাইল্‌স ব্যান্ডের সদস্যরা—সে এক দীর্ঘ তালিকা! অনুষ্ঠানটা দেখে আমার এত ভালো লাগলো, কী বলব। বাইশ বছর আগের মানুষগুলো এত ভালো ছিল? মাত্র বাইশ বছরেই এত পরিবর্তন হয়ে যায়? ওরা একেকজন কথাবার্তা বলছে, মুস্তাফা মনোয়ার স্যার থেকে শুরু করে সে সময়ের ‘পিচ্চি’ পার্থ বড়ুয়া পর্যন্ত—একেকজন কী গভীর থেকে একেকটা বাক্য উচ্চারণ করছে! বাইশ বছর আগে বোধহয় মানুষগুলোর মধ্যে অনেকখানি গভীরতা ছিল। সে সময়ের গানগুলোই দেখ, আজকের হৃদয় খানের ‘আমি যে তোমার, প্লিজ প্লিজ আমি তোমার, এখন দুইজন মিলে নাচি চলো’—এইসব গানের সাথে সেই সময়ের ‘নিউক্লিয়ার স্বাধীনতা’-র তুলনা হয়? গানের নামটাই তো অসম্ভম রকমের সুন্দর—নিউক্লিয়ার স্বাধীনতা! এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলে ফেলার লো...

এলোকথন (শ্রবণা ২)

ছবি
অল্প কিছুদিন হল, মাথায় নাইন্টিজের বাংলা ব্যান্ডগুলোর পোকা ঢুকেছে। এর দায় অবশ্য অনেকখানিই শাফিনের। আমি-শাফিন-খালিদব্রো-ইবরাহিম ভাই—আমরা চারজন লালবাগের একটা রেস্তোরাঁয় বসে ছিলাম। বসার কিছুক্ষণের মাঝেই নাটক নিয়ে আলোচনা শুরু হল, কাজেই আমি একেবারে চুপ মেরে গেলাম। নাটক-চলচ্চিত্র নিয়ে আমার যে জ্ঞান—তাতে মুখ খুললে আর মুখ লুকোনোর জায়গা পাবো না। আমি শুধু অপেক্ষা করছিলাম, কখন গানের প্রসঙ্গটা ওঠে! তখন ইবরাহিম ভাই মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকবে, আর আমি মঞ্চে নামবো! তা, প্রসঙ্গ উঠলো বটে। শাফিন একটা ভালো কাজ করেছে বোধহয়—নাইন্টিজের বাংলা ব্যান্ডগুলোর প্রায় সবই শুনে ফেলেছে। আমাদের দেশে পেপার রাইম কিংবা রকস্ট্রাটার মত এত অসাধারণ কিছু ব্যান্ড ছিল—আমি ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি আগে। গতকাল রাতে রকস্ট্রাটার প্রথম গানটা শুনতে গিয়ে রীতিমত বেকুব হয়ে গেলাম—১৯৯১ সালের ঢাকা শহরে বসে ছেলেগুলো এমন মেটাল গান গেয়েছে?! মাইরি, কী দুঃসাহস! [পরবর্তী অংশে অল্পকিছু সেন্টি আছে। ময়মনসিংহ এবং আরামবাগকে চার নম্বর মৃদুবিপদ্‌সংকেত দেখানো হচ্ছে। পরেরদিন ক্লাস বা পরীক্ষা থাকলে এখন ঘুমিয়ে পড়াটাই শ্রেয় হবে।] কিন্তু এদিকে আমি নিজে...

এলোকথন (শ্রবণা ১)

ছবি
[রিয়ার জন্য নিষিদ্ধ, খবরদার। আমি না বলা পর্যন্ত।] ডাটাবেজ পড়তে পড়তে পাগল হয়ে যাচ্ছি। যদিও অস্বীকার করার উপায় নেই—জিনিসটা খুবই জোস। এই টার্মে কাজ করার জন্য কায়কোবাদরা প্রায় চারশো গিগাবাইট ডাটা খুঁজে বের করেছে। কোনো ছবি নেই, কিচ্ছু নেই, কেবল গুটিগুটি টেক্সট দিয়ে ভরা চারশো গিগাবাইট! ব্যাপারটা দেখে আমার আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড়। একটা জিপ ফাইলে এই বিশাল দৈত্যকে আটকে রাখা হয়েছে। পুরোটা আনজিপ করলেই চারশো গিগা বের হয়ে আসবে, হাউমাউ করে কম্পিউটারের মেমোরি খেতে শুরু করবে। আমি ছোট্ট একটু অংশ আনজিপ করে দেখেছি, লেখাগুলো পড়লে আসলেই ফিল আসে। সিএসই-জাতীয় ফিল না, কাব্যিক ফিল। সে যাক। কাল বিকালে ল্যাব ফাইনাল। রিয়াটা এসে ফোন দিচ্ছিল। সে যখন ফিরে যাবে তখন আমার পরীক্ষার হলে বসে কলম কামড়ানো লাগবে—কাজেই দেখাসাক্ষাত করার উপায় নেই। অবশ্য দেখা করারও তেমন কিছু নেই। পুতুল আমরা একেকজন, যেমনে নাচাও তেমনিই নাচি। রিয়া যে বলছে, ‘সবকিছু মিলায়ে জগাখিচুড়ি হয়ে গেসে’, তাতেই কি কিছু এসে যায়? ওটাও তো পুতুলনাচেরই অংশ। একটাই সমস্যা, পুতুলগুলো সময়ে সময়ে হাসতে বা কাঁদতে পারে। সময়ে সময়ে নাচের দৃশ্যে ঢুকতেও ...

সংবিগ্ন মানুষজন ও আঁকাআঁকি বিষয়ক

ছবি
[আমি না বলা পর্যন্ত রিয়ার জন্য নিষিদ্ধ।] এক. তোহফার সাথে আমার প্রায়ই যে বিষয়টা নিয়ে তর্ক হয় সেটা হল, কে কাকে দেখে ইন্‌স্পায়ার্ড। ব্যক্তিগতভাবে আমার ধারণা, মেয়েটা অসাধারণ পেইন্টিং করে, কোন রঙটা কোথায় কতখানি গাঢ় করে মেরে দিলে কী ঘটে যেতে পারে—সেটা সে আসলেই ভালো বোঝে। আফ্রেমভের সাথে তুলনা করাটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে নিশ্চয়ই, কিন্তু আমার আশেপাশের মানুষের মধ্যে যারা রঙ সবচেয়ে ভালো বোঝে—তোহফা নিঃসন্দেহে তাদের একজন। আমি মুখ্যুসুখ্যু মানুষ, পেনসিল দিয়ে নিরীহ শেড দেয়াতেই আমার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। এই শেডও আবার ইয়াফিজ সিদ্দিকীর হ্যাঁচকা টানের শেড না, অনেক সময় নিয়ে একের পর এক স্তরে দেয়া শেড। যেসব দিনে ভীষণ হাত কাঁপে, সেসব দিন সবচেয়ে গাঢ় অংশগুলোতেও আগে টু বি বসাই। এরপর একটু ভরসা পাই, তখন ফোর বি। হাত আরেকটু শান্ত হলে সিক্স বি, ভূমিকার চুল আঁকার সময় এভাবে নাইন বি পর্যন্ত উঠেছিলাম। (সেই দিনটা আবার বাড়াবাড়ি রকমের সুন্দর ছিল, ইসিই ভবনের বারান্দার গ্রিল খোলা থাকায় ক্লাসের সবাই মিলে জানালা দিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম। সানশেডে লাইন দিয়ে বসে ছেলেমেয়েগুলো আড্ডা দিচ্ছিল। অন্তু খুব ভয় পাচ্ছিল—যদি নিচে পড়ে যায়! লাই...

লং শট

ছবি
[ময়মনসিংহের জন্য নিষিদ্ধ। টানা তিনটা উইকলি না দেয়া পর্যন্ত।] “সেদিন বরষা ঝরঝর ঝরে কহিল কবির স্ত্রী, ‘রাশি রাশি মিল করিয়াছ জড়ো রচিতেছ বসি পুঁথি বড়ো বড়ো মাথার উপরে বাড়ি পড়ো-পড়ো, তার খোঁজ রাখ কি!” সোনার তরী কাব্যগ্রন্থে কবিতাটা ছিল। এদ্দিন বাদে হঠাৎ মনে পড়ল। সে এক সাংঘাতিক কবিতা, সাড়ে ছ’শো লাইন—সেই কবিতার ভেতরে আবার আরেকটা পুরো কবিতা! ঘটনাটা এমন—এক রাতে খুব বৃষ্টি হচ্ছে, তার মাঝে কবি কেবল লিখেই যাচ্ছে, আর তাই দেখে বেচারাকে তার স্ত্রী খুব করে বকে দিচ্ছে—দিনরাত কবিতা লিখলেই হবে? টাকার অভাবে বাড়িঘর যে ভেঙে পড়ছে! যাও না একবার রাজামশাইয়ের কাছে, উনি বড় দয়ালু, গুণী লোকদের নাকি কদর করেন। এই শুনে কবি বেচারা ভয়ে এতটুকু হয়ে গেল। স্ত্রীকে তার বড্ড ভয়, ওদিকে আবার রাজাকেও ভয়। কী আর করা, শেষপর্যন্ত স্ত্রীভয়ের কাছে রাজার ভয় হার মানলো, কবি রওনা দিলো রাজপ্রাসাদের দিকে। আর এদিকে কবির স্ত্রী কিন্তু কবিকে খুবই ভালোবাসে, বাইরে যতই বকাবকি করুক। কবি ঘোড়ায় চড়ে রাজপ্রাসাদে যাচ্ছে, আর কবির স্ত্রী মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে। সে যাক, কয়েকশো লাইন পরের ঘটনা, কবি রাজার সামনে বসে আছে। কবিতাপাঠ...

আগুনের পরশমণি

ছবি
আমার ধারণা, পৃথিবীর প্রতিটা মহৎ কাজের জন্ম হয় গভীর দুঃখ থেকে। বছরদুয়েক আগে এই শহরটা ভুতুড়ে একটা সময় পার করছিল। রাজনীতির সবচেয়ে অন্ধকার অংশটুকু সেই সময় প্রথমবারের মত আমাকে সামনাসামনি দেখতে হয়েছে। মাত্রই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি তখন। ক্লাস শুরু হয়নি, কাজেই হাতে কাজকর্ম নেই। প্রচুর গান শুনতাম। আর দিনরাত ছবি আঁকতাম। প্রায় প্রতিদিনই মেসালদের সাথে আড্ডা দিতাম। আর প্রায় প্রতিদিনই এই শহরের মানুষেরা পুড়ে মরত। মানুষ বড় সস্তা ছিল তখন, চাইলেই একসাথে দু-দশজনকে পুড়িয়ে মারা যেত। আমার বয়সী একটা ছেলে একদিন তার বাবার ট্রাকে বসে ছিল। ঘুমাচ্ছিল। সেই বাসে আগুন দেয়া হল, ছেলেটার পঁচানব্বই ভাগ পুড়ে শেষ। সেই অবস্থায় সে দুদিন বাঁচলোও। কী কষ্ট! পোড়ার যে কষ্ট—সেটা যার কখনো হয়নি তার জন্য বোঝা কঠিন। (এই প্রসঙ্গে আরেকটা কথা বলে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে। এই ব্যাপারটা কিছুটা লিখেছিলেন নোবেলজয়ী স্ভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ, তাঁর ভয়েসেস ফ্রম চেরনোবিল বইটাতে। চেরনোবিল দুর্ঘটনার পর আশেপাশের অনেক লোক রেডিয়েশনে পুড়ে গিয়েছিল, মানুষগুলো কীভাবে হাসপাতালে ধীরে ধীরে মরে গেল—সেই ভয়ংকর কষ্টের বর্ণনা বইটাতে আছে। আমি যখন দিনাজপুরের স...

Eleanor Rigby

ছবি
আজকের রাতটা তাৎপর্যপূর্ণ একটা রাত। শেষ রাতের বৃষ্টিতে আমার শহরটা ভেসে যাচ্ছে। অথচ গতকাল ঠিক এই সময়ে বৃষ্টির কণামাত্রও ছিল না। আকাশজুড়ে খুব হালকা একটা আলো ছিল। কৃষ্ণা পঞ্চমীর চাঁদ কি অতক্ষণ থাকে? জানি না, কিন্তু একটা যে আলো ছিল—সেটা তো মিথ্যে না, আর সেই আলোয় আলাদা করে মেঘগুলো দেখা যাচ্ছিল। এত পবিত্র একটা দৃশ্য! গতকাল রাতে ঘুমোতে গিয়েছিলাম একটা মুগ্ধতা নিয়ে। কারণ কিছুক্ষণ আগে আমি একজন অসাধারণ মানুষকে আবিষ্কার করেছি। এমনিই নেটে ঘোরাঘুরি করছিলাম, হঠাৎ করেই আমার মনে হল, সে অদ্ভুত ভালো একজন মানুষ। চেনাজানা মানুষের ভেতর থেকে যখন অসাধারণ একজন বের হয়ে আসে—এর চেয়ে অদ্ভুত সুন্দর ব্যাপার আর কী হতে পারে? নাকি আমাদের ম্যাথ অলিম্পিয়াড করা ছেলেমেয়েগুলো—ওরা কি এমনিতেই এত চমৎকার একেকজন মানুষ হয়? কে জানে! কিন্তু আজকের রাতটা গতকালকেও ছাড়িয়ে যাবে দেখছি। শুরু হয়েছিল খুবই সাধারণভাবে। কাজ করছিলাম, এমন সময় তটিনী ফোন দিল। মানুষজনের যে বকা খাওয়ার এত আগ্রহ থাকতে পারে—সেটা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। টাকা খরচ করে কেন মেয়েটা বকা খায়, কে জানে। কিন্তু কোন কোন দিন একটু অন্যরকম হতে বাধ্য। আম...

ফারহার সন্ধ্যা

ছবি
৬ জুন, ২০২৩ আজকের সন্ধ্যেটা কি একটু বেশি নীল ছিল? হয়তোবা। সারাদিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টি হওয়ার পর সন্ধ্যেটা একটু বেশি সুন্দর দেখাবে—এটা অস্বাভাবিক কিছু না। শেষবিকেলে নিজের ঘরে ঢুকে নিজেই মুগ্ধ হলাম। খোলা জানালা দিয়ে নীল আলো আসছে, সারা ঘর ভেসে যাচ্ছে সেই আলোয়। ধবধবে বিছানার চাদর বাতাসে উড়ছে—এত সুন্দর একটা দৃশ্য! অবশ্য মন খারাপ হতেও খুব বেশি সময় লাগলো না। এমন সুন্দর একটা সন্ধ্যা, অথচ ভাইয়া দেখবে না। ভাইয়া যেদিন মারা যায়, সেই সন্ধ্যেটা আরও গাঢ় নীল ছিল। ময়মনসিংহ শহরটা ভেসে যাচ্ছিল বৃষ্টিতে। আর আমি চুপ করে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মাথা ঝিমঝিম করছিল, বেশ বুঝতে পারছিলাম জ্বর আসছে। তবু জানালা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছিল না। আমি তখন ক্লাস টেনে। আর ভাইয়া পড়ত বুয়েটে থার্ড ইয়ারে। ভার্সিটিতে ওঠার পর প্রথম যেদিন ময়মনসিংহ ছেড়ে যায় ভাইয়া, আমাকে হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘এই যে যাচ্ছি, বছর শেষ হওয়ার আগে আর আসবো না।’ তাই শুনে আমার সে কী কান্না! ভাইয়া বরাবরের মতই আমাকে পাত্তা না দিয়ে বের হয়ে গেল। আমি রাগ করে সেদিন ভাত খেলাম না। রাতে সে ফোন দিলো, আমি কথাও বললাম না। ওমা, সপ্তাহখানেক পরেই এক দ...

আশ্রয়

এটা খুবই আশ্চর্য, কেন কেবলমাত্র মেলানকোলিয়ায় ডুবে গেলেই ছবি আঁকতে ইচ্ছে করে। পৃথিবীর মানুষগুলো রুদ্ধশ্বাসে দৌঁড়াচ্ছে, এই সময়ে ফ্লয়েডেড অবস্থায় আরেকটা ছবি আঁকতে বসার অর্থ—সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখানো। যে বুড়ো আঙুল দেখায়, সে বোকা। আর বোকারা সবসময়ই একা। রবির ভাষায়, সবার মাঝে আমি ফিরি একেলা। গিলমোরের ভাষায়, আর্থ বাউন্ড মিসফিট। ঠিক এই মুহূর্তে এসে মানুষ কিছু একটা করে ফেলে। কেউ সিদ্ধার্থের মত গৃহত্যাগী হয়। কেউ জন লেননের মত অবিশ্বাস্য একটা গানের দল বানিয়ে ফেলে। কেউ জীবনের প্রথমবারের মত একটা ছবি আঁকতে পারে। শেষ পর্যন্ত সবাই জীবনের অর্থটুকু খোঁজে। সিদ্ধার্থ খুঁজেছিলেন সন্ন্যাসের মধ্য দিয়ে। জন লেনন খুঁজেছিলেন তাঁর লেখা অসাধারণ গানগুলোর মধ্য দিয়ে। কে জানে, হয়তো এর ভেতর দিয়েই চূড়ান্ত পরিত্রাণ আসে, তাই মানুষ অর্থটুকু খুঁজে বেড়ায়। আর খুঁজে বেড়ায় আশ্রয়। দিনশেষে প্রতিটা মানুষই আশ্রয় খোঁজে। সাদাসিধে একজন মানুষ। দিনশেষে দুটো কথা। কেবল অকাজের কথা। এই কথায় শাহবাগের মিছিলের প্রসঙ্গ আসবে না। এই কথায় ইলেকট্রন-প্রোটনের গুরুতর রহস্য যাচাই করা হবে না। চুলোয় যাক ভয়েজার স্পেসশিপ, আকাশে দুবার উল্ট...

ক্ষুদ্র পুরাতন প্রশ্ন

ছবি
জর্জ হ্যারিসনের একটা গান ছিল, হোয়াট আই ফিল, আই ক্যান্ট সেই। (জর্জ ছেলেটা না, বেড়ে গাইতো। একদিন ওকে নিয়ে লেখার ইচ্ছা আছে।) আজকাল এই অনুভূতিটা প্রায়শই হচ্ছে আমার। হোয়াট আই ফিল, আই ক্যান্ট সেই। এই মাস দেড়েক আগেও, এক রাতে আকিব ছেলেটা বিশাল বিশাল মেসেজ দিচ্ছিল। সে কী ভাষা, একেকটা মেসেজের মধ্যে নেলসন ম্যান্ডেলা থেকে শুরু করে বাংলাদেশে ইতিহাসে সমাজতন্ত্রের ভূমিকা পর্যন্ত সবকিছুই লিখে ফেলছে। আমি পড়ে শেষ করতে পারি না, একটা শেষ করার আগেই আরেকটা বিশাল মেসেজ চলে আসে। (আজকাল ছেলেটা বুর্জোয়াদের স্বর্গভূমির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লিস্টেড হয়েছে দেখে বিপ্লবের স্বর্ণক্ষেত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঘোরাফেরা করা মানুষদের পাত্তা দেয় না। তাতে খুব সমস্যা হয় না অবশ্য, কারণ আরামবাগ কিংবা ময়মনসিংহ হয়ে তার খবর আমার কাছে আসে।) যাকগে, সে রাতে আকিবের দুঃখভরা কথাগুলো শুনে আমার আবারও একই অনুভূতি হচ্ছিল। জীবনের অর্থ কী? আমাদের কাজগুলো শেষপর্যন্ত কোথায় পূর্ণতা পাচ্ছে? কিংবা, আদৌ কি পাচ্ছে? প্রশ্নগুলো কি আরজ আলী সাহেবের মত হয়ে যাচ্ছে? হা হা! হয়তোবা। কিন্তু শেষপর্যন্ত এই প্রশ্নগুলোই আমাদেরকে সবচেয়ে বেশি ...

অবোধ

ছবি
এক. আমাদের পাশের বাসায় গতকাল একজন মারা গেছেন। দীর্ঘ উনিশ বছর ধরে একই এলাকায় আছি তো, অনেকগুলো জন্ম-মৃত্যু দেখতে হয়েছে আমাকে। আমার কেন যেন একটাও বিশ্বাস হয় না। এই ধরো, আপুর ঘর থেকে কোণাকুণি যে বাসাটা দেখা যায়—সেখানে একটা ছেলে থাকতো। সিক্স-সেভেনে পড়ে হয়তোবা। সারাদিন দৌঁড়াতো। আর ওর ছোট বোনটার সাথে দুষ্টুমি করতো। ওদের খিলখিল হাসি আমাদের বাসা থেকেও শোনা যেত। মন খারাপ থাকলে প্রায়ই আপুর ঘরের জানালা দিয়ে আকাশ দেখতাম, তখন ওদের দিকেও চোখ পড়ত। (উল্লেখ্য, আমার জানালা দিয়ে একটুখানি আকাশ দেখা যায়। আপুর জানালা দিয়ে দেখা যায় অনেকখানি। ছোটবেলায় আপুর ঘরের প্রতি আমার আলাদা একটা ভালোবাসা ছিল। সেটা জানালার জন্যও হতে পারে, আপুর আদরের জন্যও হতে পারে—কে জানে।) একদিন পাশের বাসার সেই ছেলেটা মারা গেল। হঠাৎ একিউট লিউকেমিয়া ধরা পড়ল, ঠিকঠাক চিকিৎসা শুরু করার আগেই সব শেষ। ব্যাপারটা আমি জানলাম কলেজে যাওয়ার সময়। সকালবেলা বাসা থেকে বের হয়েছি, এমন সময় হাউজিং-এর মাইকে ঘোষণা করা হল, ছেলেটা মারা গেছে। ওর ছোট বোনটা প্রায়ই বারান্দার জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতো। চুপ করে। সেও দেখত দেখতে বড় হয়ে গেল। ছেলেটার বয়...

বীত

ছবি
অনেকদিন পর নানুকে স্বপ্নে দেখলাম। প্রায় সাড়ে ছয় বছর আগে যেই মানুষটা মারা গেছে—সে যখন স্বপ্নে আসে তখন ব্যাপারটা খুব স্বাভাবিক মনে হয়। আমার কাছেও মনে হল। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নানুর সাথে গল্প করলাম। ঘুম ভাঙার কিছুক্ষণ পর মনে পড়ল, নানু আসলে নেই। নানাভাই চলে গিয়েছিল এক বেলার নোটিশে। দুপুরে স্ট্রোক করল, বিকালের দিকেই সব শেষ। নানাভাই মারা যাওয়ার পর কে যেন নানুকে বলছিল, 'বুড়োটা তো ফাঁকি দিয়ে চলে গেল, তুই আবার ওভাবে যাস না!' (নানুবাড়ির ওদিকে কাছের মানুষজনকে তুই করে বলার রীতি ছিল। আম্মুও প্রায়ই আদর করে নানুকে তুই বলে ডাকতো। নানাভাইকে অবশ্য আপনি বলেই ডাকতো—যদ্দূর মনে পড়ছে।) নানুকে ফাঁকি দিয়ে যেতে নিষেধ করা হল, নানুই উল্টো বড় ফাঁকি দিল। এক রাতে খেয়েদেয়ে ঘুমাতে গেল, সকালে আর উঠলো না। রাতেরবেলা আমরা কেউ না কেউ নানুর সাথে ঘুমাতাম। যদি হঠাৎ কিছু দরকার হয়। সাধারণত সুপ্তিই ঘুমাত নানুর সাথে। সে রাতেও ঘুমিয়েছিল। বেচারা তখন অনেক ছোট তো, সকালে উঠে কিছু বুঝতে পারেনি। সে দেখে, নানু ঘুম থেকে উঠছে না, হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। তার মনে হল, নানুর খুব ঠাণ্ডা লাগছে। গায়ে একটা কাঁথা টেনে দিয়ে সে...

এলোকথন (বিশাখা ১)

ছবি
[ আবারও নিষিদ্ধ! আরামবাগ-জিগাতলা-ময়মনসিংহের জন্য। পরীক্ষা শেষ কর আগে। গাধা।] ইদানিং কী হয়েছে জানি না, যা মনে আসছে তাই লিখে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে। যা ইচ্ছে তাই লিখে ফেলা কোন কাজের কথা না, আনিসুল হকের মত একজন মানুষ এই করতে করতেই বখে গেলেন। অবশ্য, আমি যাচ্ছেতাই লিখলে বড় কোন সমস্যা হওয়ার কথা না। আনিসুল হকের লেখার অর্থ বাংলা সাহিত্য। হেলাল হাফিজের লেখার অর্থ বাংলা কাব্য। ওনারা যা মনে আসে তাই ছাপিয়ে দিলে এই ভাষার গায়ে কালিমা লাগে। আমি নিতান্ত খেলো একজন মানুষ​—এই যুক্তিতে আমি যাচ্ছেতাই লিখে যাই। এবং ইফরীতের ভাষায়, "নোবেলের সেসব লেখা তার ব্লগে ছাপাও হয়ে যায়"। আচ্ছা হোক। তাতে খুব বেশি ক্ষতি নেই বুঝিবা। খুব, খুব অদ্ভুত, একটু আগে বাসার সামনের রাস্তাটা ধরে হাঁটছিলাম। কিছুদূর আগানোর পরেই মাথা এলোমেলো হয়ে গেল​—সারা রাস্তা জুড়ে খুব চেনা একটা ঘ্রাণ। ঘ্রাণটা চেনা, কারণ আমি প্রতিবার দাদুবাড়ি গেলে এই গন্ধটা পাই। পুরো ঠাকুরগাঁও শহরজুড়েই আমি আলাদা আলাদাভাবে এটা পাই। পোড়াকাঠের ঘ্রাণ থেকে শুরু করে মুদির দোকানের ঘ্রাণ — সবকিছুই আমাকে সেই ফেলে আসা শহরটার কথা মনে করিয়ে দিল। এবং কয়ে...