পোস্টগুলি

এলোকথন (আষাঢ়া ২৫:১)

ছবি
আমি জানি, এইসব এলোকথন একদিন ছাই হয়ে উড়ে যাবে, আর সেই ছাই থেকে জন্মাবে আরো এক রাশ ছাই। ছাইয়ের ধুলা, আমার প্রতিটা দীর্ঘনিশ্বাসের ধুলা, চোখের অজান্তে ভেতরে ঢুকে যাওয়া ধুলা—সকল ধুলা উড়ে বেড়াবে ধুলাময় এই শহরের আকাশে। দেহহীন মাথাগুলো গোলটেবিলের দশপাশে জড় হয়ে ভাবতে বসবে এ থেকে মুক্তি কোথায়, অন্যদিকে মাথাহীন দেহগুলো ধুলারে মেরে মেরে কাদা করে দিতে থাকবে, প্যাঁচপেঁচে সেই কাদায় ডুবে দেহরা চিৎকার করবে, প্যাঁচপেঁচে সেই কাদায় না-ডুবে মাথারা চিৎকার করবে, ফলে নিশ্চিতভাবেই তারা কাদা-সমস্যায় আক্রান্ত হবে।  কেননা এইসব এলোকথন একদিন ছাই হয়ে উড়ে যাবে, আর কে না জানে, ছাই থেকে কেবল ফিনিক্সই জন্মায় না, কখনো জন্মায় কেবল আরেক রাশ ছাই।  তখন সেক্রেটারিয়েটে কার্পেট বিছানো অফিসে বসে দেহহীন মাথার মনে পড়বে, বস্তুত ছাই থেকে ফিনিক্স জন্মায় না, ফিনিক্সই খানিকক্ষণের জন্যে ছাই হয়ে যায়। এবং ক্রমান্বয়ে সে মাথা তুলে উঁকি দেয়, পাখা তুলে ঝাপটা দেয়, একসময় উড়ে যায়, পেছনে পড়ে থাকে তার ছাইটুকু।  সেক্রেটারিয়েটের সুগন্ধ-কফিতে চুমুকের পর চুমুক দিয়ে দেহহীন মাথা হিসাব মিলাতে থাকবে, কিন্তু ধুলোময় শহরে উজ্জ্বল ...

ভাষা এবং বোধ

ছবি
বোধ শব্দটা ব্যাখ্যা করিতে গিয়া আমরা সচরাচর জীবনবাবুকেই স্মরণ করিয়া থাকি। তিনি প্রসঙ্গটা তুলিয়াছিলেন এইভাবে—  আলো-অন্ধকারে যাই—মাথার ভিতরে  স্বপ্ন নয়,—কোন্‌ এক বোধ কাজ করে!  স্বপ্ন নয়—শান্তি নয়—ভালোবাসা নয়,  হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়!  অর্থাৎ প্রায়শই আমরা কিছু অনুভূতির দ্বারা তাড়িত হই—যাহাদিগকে আমরা আমাদের প্রচলিত ধারণা (স্বপ্ন, শান্তি, হয়তো ভালোবাসা) দিয়া সংজ্ঞায়িত করিতে পারি না। সেক্ষেত্রে আমরা বোধ শব্দটার আশ্রয় লই। অদ্য সন্ধ্যায় আমার অভ্যন্তরে এক ধরনের বোধ জন্ম নিয়াছে—এই কথাটার অর্থ হইল, অদ্য সন্ধ্যায় এমন কোনো অনুভূতি আমাকে তাড়িত করিয়াছে—যাহার সহিত আমার পূর্বপরিচয় ছিল না, কিংবা থাকিলেও উহাকে আমি ভাষার দ্বারা ব্যাখ্যা করিতে পারিতেছি না।  ইহা বোধের খুব গুরুত্বপূর্ণ একখানা বৈশিষ্ট্য—সচরাচর বোধের এই অনুভূতিগুলো অপার্থিব হইয়া থাকে, এবং আমরা ইহাকে সরাসরি ভাষার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করিতে পারি না।  উল্লেখ্য, অকারণ-দুঃখ, যাহাকে ইংরেজিতে ডাকা হয় melancholia —তাহার সহিত ইহার স্পষ্ট পার্থক্য রইয়াছে। সব মেলানকোলিয়াই বোধের জন্ম দেয় না, এবং প্র...

আবু তালেবের উপাখ্যান

ছবি
আমরা পেছন ফিরে তাকাবো, এবং কে জানে, হয়তো ২৩ এপ্রিল, ১৬৮২-তেই আমাদের দৃষ্টি পড়বে।  আমরা দেখবো, বুড়িগঙ্গার পাড়ে বড়সড় কোনো অশ্বত্থ গাছের নিচে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। আমরা ধরে নিবো, তার নাম লাল মিয়া।  এপ্রিলের ঐ দিনটাতে হয়তো খুব একটা গরম থাকবে না। কারণ বিক্রমপুরের উপকণ্ঠে ঢাকা নামের এলাকাটাকে হয়তো আমরা জঙ্গলাকীর্ণই দেখবো, সে হয়তো অজস্র আমের মুকুলের ঘ্রাণে আর বুড়িগঙ্গার বয়ে আনা শীতল বাতাসে লাল মিয়ার পরানডা জুড়ায়ে দিবে।  তবু আমরা লাল মিয়াকে ঘামতে দেখবো। অকারণেই বারবার ধুতির খুঁট তুলে মুখ মুছতে দেখবো।  কাজেই আমরা অনুমান করবো, লাল মিয়া বড্ড চিন্তা করে। হ্যায় কী জানি ভাইবা ভাইবা চোখমুখ ঘামায়া ফালায়।  এবং আমরা ১৬৮২ সালের কোনো এক দিনে, হয়তো ১৫ মেই হবে সেটা, সেই দিনটার দিকে যখন দৃষ্টিপাত করবো, তখন বুড়িগঙ্গার তীরের অশ্বত্থ গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা লাল মিয়ার দিকে আমাদের দৃষ্টি পড়বে, এবং আমরা অকারণেই তাকে ঘামতে দেখবো। আমরা কৌতূহলী হয়ে তার দিকে একটু এগিয়ে যাবো। আমরা বিড়বিড় করে তাকে বলতে শুনবো,  আবু তালেবের বাড়িত যামু  শাগ-ডাইল আর বিনুন খামু।...

শায়েস্তা খাঁয়ের দুর্গ এবং আমাদের বোধ

ছবি
এক.  শায়েস্তা খাঁয়ের নামের সাথে যে কথাটা রীতিমত চুইংগামের মত লেগে আছে সেটা হল, তাঁর আমলে টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেতো। ব্যাপারটা খুবই কৌতুককর—বেচারা শায়েস্তা খাঁ ঢাকার জন্য এত কিছু করে গেলেন—সব বাদ দিয়ে আমরা মনে রাখলাম কেবল চালের দরের জন্য!  গতকাল লালবাগ দুর্গে ঢুকে এ কথাটা বারবার মনে পড়ছিলো। ঢাকার প্রাচীনতম নিদর্শনগুলোর মধ্যে যেগুলো এখনও কোনোমতে টিকে আছে—তার একটা এই দুর্গ। এবং এর সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে যার নাম তিনি হলেন মির্জা আবু তালিব ওরফে রুকুন-উস-সুলতান আমির-উল-উমেরা নওয়াব শায়েস্তা খাঁ বাহাদুর।  দুই.  শায়েস্তা খাঁকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিলো শাস্তি হিসেবে। তখন সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসন চলছে। শায়েস্তার কোনো এক কাজে ক্রুদ্ধ হয়ে সম্রাট তাঁকে ঢাকায় বদলি করে দেন। ব্যাপাটা মোটামুটি অনুমান করা যায়, ১৬৬৪ সালে ঢাকার তেমন কোনো আহামরি অবস্থা ছিলো না, রাজধানীর মর্যাদা পাওয়ার পরেও। ঢাকা ছিলোই বা কতটুকু—বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে ছোট্ট একটু জায়গা নিয়ে কিছু মানুষ থাকতো। সরকারি কর্মকর্তাকে পাড়াগাঁয়ে বদলি করে দিলে যেমন হয়—শায়েস্তাও নিশ্চয়ই অমন একটা অনুভূতি নিয়েই ঢাকায় এসেছি...

এলোকথন (চিত্রা ২৪:২)

ছবি
আমি আজকাল লিখতে পারি না।  এতে আশ্চর্য হবার তেমন কিছু নেই। সত্যিকারের লেখক লিখবে, ভণ্ডরা লিখবে না—এটাই স্বাভাবিক। পুরো স্বাভাবিকতার মাঝে একমাত্র সমস্যা হল, আমার লিখতে না পারলে খারাপ লাগে। আর কিছু না হোক, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ভরে আমার ডায়েরি লিখতে হয়। এলোকথন শিরোনামে এলোমেলো কথাবার্তা লিখতে হয়। কখনো হালকা গল্প, কখনো ভারী গল্প বানাতে হয়। তবেই আমি শান্ত থাকি। রাত্রিবেলা ঘুমোতে পারি, সারাদিন শরীরটা ঝরঝরে থাকে।  ক’মাস হল, এর কোনোটাই ঠিকমত হচ্ছে না। খ্যাপার মত দিনরাত বই পড়ছি, শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি, আড্ডা দিচ্ছি—কিছুই কাজ করছে না। ঘুরছি শহরের বাইরেও। কেবল গত তিন মাসে যত ঘুরেছি—সারা জীবন অতখানি ঘুরেছি কিনা সন্দেহ আছে। কখনো মন ভালো করছি, হাসতে হাসতে গড়াগড়ি দিচ্ছি, আবার তীব্র বিষাদে আক্রান্ত হয়ে চুপ করেও বসে থাকছি।  কাজ হচ্ছে না কিছুতেই।  অর্থাৎ আমি লিখতে পারছি না। অথচ এ ব্যাপারটা এখন সবচেয়ে বেশি ঘটার কথা। এই গত বছরেও, প্রতিটা নতুন বোধের সাথে কিছু না কিছু লিখে ফেলতাম—বাচ্চাদের মত করে হলেও। সে হিসেবে গত তিন মাসে যতখানি ঘাত-অভিঘাত পার করেছি—ওতে তো লিখে কূল পা...

এলোকথন (চিত্রা ২৪:১)

ছবি
চৈত্রের প্রাকমুহূর্তটা সময়ে সময়ে খুব নির্মম হয়ে দাঁড়ায়। হয়তো আমরা শহরের চেনা পথটা ধরে হাঁটি, হয়তো প্রেসক্লাবের সামনের একটা বাসে ঝুলতে থাকি, কিংবা ব্যস্ততম রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে রিকশার জন্য অপেক্ষা করি, এবং ঠিক তখনই চৈত্রের বাতাস এসে একটা ঝাপ্টা দিয়ে যায়।  কখনো মুহূর্তের জন্য, কখনো দীর্ঘক্ষণের জন্য।  এতে কিছু এসে যায় না, কারণ বাতাসের প্রথম স্পর্শেই আমরা আনমনা হয়ে যাই। পুরো পৃথিবীটা জলরঙে আঁকা একটা ছবির মত মনে হয়। আফ্রেমভের উজ্জ্বল রঙ না, তোহফার দুঃখ-মেশানো হালকা রঙ।  হাতে থাকা বইটাতে চোখ বোলানোর চেষ্টা করি। শব্দগুলো আমাদের চোখ পর্যন্ত আসে, মর্মে পৌঁছে না। হেডফোনজুড়ে হ্যারিসন অলৌকিক কিছু কথা আওড়াতে থাকে। শব্দগুলো আমাদের কান পর্যন্ত আসে, মর্মে পৌঁছে না।  অর্থাৎ আমরা একটু আনমনা হয়ে যাই।  এবং এইসব মুহূর্তে আমার অনিকের কথা মনে পড়ে। কলেজ-পরবর্তী জীবনে তার প্রতি আমার নির্বিকারত্বের কথা আমার মনে পড়ে।  এবং অমন নির্বিকারত্ব সন্দেহাতীতভাবে ছিল একটা পাপ। এই পাপের প্রতিফল কীভাবে আসবে—সে কথাও আমার ভাবতে ইচ্ছে করে।  যদিও ভয় লাগে। ইচ্ছে করে...

শূন্যতাবোধের বৃত্তান্ত

ছবি
[ফারহার জন্য নিষিদ্ধ। আগে এসএসসি শেষ কর বাঁদর।] আমরা কেবল পূর্ণতাতেই ঋদ্ধ হই না, হই শূন্যতাতেও। আমার মনে পড়ে, আজ থেকে প্রায় বছর দেড়েক আগে এক শূন্যতাবোধ আমাকে আক্রান্ত করেছিল। জীবনে প্রথমবারের মত। এই বোধের সাথে আমার পূর্বপরিচয় ছিল না—আমি তখন মাত্র একুশ বছর বয়সে পা রেখেছি—ভার্সিটি, কংগ্রেসের কাজকর্ম, বইপত্র, গান, আঁকাআঁকি, এবং চারপাশের অসম্ভব সুন্দর কিছু মানুষকে নিয়ে একটা পূর্ণতা অনুভব করার চেষ্টা করছি—ঠিক সেই মুহূর্তেই পা হড়কে গেল। প্রপাত ধরণীতল হলে তবু সামলে নিতে পারতাম, আমি পড়লাম অতল জলে। গভীর সমুদ্রে ডুবে যাওয়ার অনুভূতিটা খুব একটা সুখকর না। কাজেই আমি প্রচণ্ড অস্বস্তিতে ভুগতে শুরু করলাম। এক রাত উদ্‌ভ্রান্তের মত লিখলাম। পরক্ষণেই সব কেটে দিলাম। পরদিন খ্যাপার মত ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে বসে থাকলাম। কখনো রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম, বৃষ্টিধোয়া বিকেলে ক্যাম্পাসজুড়ে অকারণেই হাঁটলাম। কাজকর্ম ছেড়ে দিতে ইচ্ছে হল, গল্পের বই ছুঁড়ে দিতে ইচ্ছে হল। সবকিছু হারানোর স্পষ্ট একটা অনুভূতি আমার ভেতরটা একেবারে ফাঁপা করে দিয়েছিল। আমার আশ্চর্য লাগে এই ভেবে যে, ঠিক সেই মুহূর্তে আমি কী মনে করে ভূমিকার অস...

গোর

ছবি
....পদ্মর নানাভাইয়ের কবরের পাশের গাছটা খুঁজে পেতেই কবরটাও সহজেই খুঁজে পেলাম।  এবং, সেই কবরের মাথায় দেখি একটা এপিটাফ, নানাভাইয়ের নাম লেখা। পাথরে খোদাই করা না হলে কি সেটাকে এপিটাফ বলে ডাকা যায়? হয়তোবা ওটাকে এপিটাফ বলে না, হয়তোবা ওটাকে সাইনবোর্ড বলেই ডাকে সবাই। আবার হয়তো ওটাকে কিছুই ডাকে না। আমি এপিটাফ বলেই ডাকবো। তো দেখি যে, এপিটাফটায় আনুষ্ঠানিক কিছু কথাবার্তা লেখা, কিছু দোয়া-দরুদ। এবং কিছুক্ষণের মাঝেই আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, এই গোরস্থানে এপিটাফের একটা ফরম্যাট আছে। দেখেই বোঝা যায়, কিছু আছে কমদামি এপিটাফ—ওগুলোতে এক ধরনের লেখা। আরেকটু দামি এপিটাফ হলে আরেক ধরনের লেখা। সবগুলোর ফরম্যাট একই, কেবল কেউ মারা গেলে সেখানে মৃত ব্যক্তির নাম আর তারিখ বসিয়ে দেয়া হয়। এবং এরও কিছুক্ষণ পর, আরও আশ্চর্যের একটা জিনিস খেয়াল করলাম। পদ্মর নানাভাইয়ের পাশে আরেকটা কবর—আমার ঝাপসা মনে আছে, যেই রাতে নানাভাইকে কবর দেই তখন এ জায়গাটা ফাঁকা ছিল। খেয়াল করে দেখলাম, মাত্র দিনদশেক আগে এক ব্যক্তি মারা গেছে, ওনাকে মাটি দেয়া হয়েছে এখানে। কিন্তু আশ্চর্য এই যে, দশ দিনেই সেই কবরের ওপরের ঘাস জীর্ণ হয়ে শুকিয়...

হার্ট অফ গোল্ড

ছবি
নিল ইয়াং-এর একটা গান ছিল, I was searching for a heart of gold, and I’m getting old. আচ্ছা, হার্ট অফ গোল্ড আদৌ কী? মানুষ কেন এটা খোঁজে? ওরা কি সেই হরিণের মত, যে নিজের কস্তুরীর ঘ্রাণে পাগল হয়ে যায়, বনে বনে সেই ঘ্রাণের উৎস খুঁজে বেড়ায়? কেনই বা মানুষ বৃদ্ধ হয়ে যায়? ওরা কি রবিবাবুর কবিতার সেই খ্যাপা, যে সারাজীবন পরশপাথরের খোঁজে ছুটে বেড়ায়? হয়তো…হয়তো। তৃতীয় চোখটা খুলে গেলেই মানুষগুলো হরিণ হয়ে যায়, ওরা খেপে যায়। হৃদয়ের শুদ্ধতম অংশটুকু খোঁজার জন্য ওরা গভীর থেকে গভীরে ডুব দেয়। ডিপ ইনসাইড, প্রতিটা মানুষই কি সুন্দর না? তবু কেন আরেক দল মানুষ খোলস নিয়ে ব্যস্ত থাকে? হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছোবার আগে খোলসটাই চোখে পড়ে—এজন্যই কি? আমার মন ভালো নেই। কাছের কিছু মানুষের খোলস-সাজানো দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত, এবং হতাশ। ওরা আগ্রহের সাথে ঘ্রাণ মাখে, তীব্র উৎসাহে রঙ লাগায়, চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে থাকে। আচ্ছা, আমার দাদুবাড়ির শিউলী গাছটা যদি ‘ইভনিং ইন প্যারিস’ মেখে বসে থাকতো, তবে ভালো হত না? শিউলীর হালকা ঘ্রাণ তো ভোরের বাতাসেই হারিয়ে যায়, কড়া সুগন্ধী মাখলে সবাই নিশ্চয়ই ঘুরে ...

চাঁদ নেমে আসে

ছবি
“Everybody had a hard year Everybody had a good time Everybody had a wet dream Everybody saw the sunshine Oh yeah, oh yeah, oh yeah!” গানটা হঠাৎ করে মাথায় ঢুকে গেছে। অবশ্য, গান মাথায় ঢোকে হঠাৎ করেই। অন্যদের ব্যাপারটা জানি না, আমার ক্ষেত্রে একেকটা গান মাথায় ঘুরতে শুরু করে, আর আশেপাশের সকল কিছুর সাথে সেটার একটা সম্পর্ক দাঁড়িয়ে যায়। যেমন, আজকে! আজ দুপুরে (কিংবা সকালেও হতে পারে) মাথায় একটা বাক্য এসেছিল। কোথাও লিখে রেখেছিলাম, ‘সেই জানালা দিয়ে রাত্রিবেলা চাঁদ নেমে আসতো।’ এই একটা বাক্যই। এবং কী সুন্দর, এই বাক্যটার সাথেই গানটার সম্পর্ক দাঁড়িয়ে গেল। Everybody had a hard year, everybody had a good time …। ধরো, জৈষ্ঠ্যের মাঝামাঝি কোনো এক সময়। বেশ গরম, মাথার ওপরে ঘোরলাগা বনবন শব্দে ফ্যানটা ঘুরছে। মাত্রই সন্ধ্যে পার হয়ে রাত নেমেছে। তুমি ঘুমিয়ে ছিলে, কিছুক্ষণ আগে জেগে উঠেছো। ঘুম ভেঙে দেখলে, ঘরটা এলোমেলো, ঘুটঘুটে অন্ধকার। খোলা জানালা দিয়ে চাঁদ নেমে আসছে। তার আলো পড়ছে তোমার চোখেমুখে, সারা বিছানায়… ঠিক সেই মুহূর্তে একটা মানুষের কেমন অনুভূতি হয়? আমি জানি না। তবে দ...

ব্রহ্মার পুত্র, ব্রহ্মার কন্যা

ছবি
[আরিফের জন্য মৃদু সতর্কবার্তা। ফারহার জন্য ছয় নম্বর বিপৎসংকেত। বাকিদের সমস্যা নেই।] গতকাল ময়মনসিংহ গিয়েছিলাম। গাধাটা ক’দিন ধরে বেশ মনটন খারাপ করে বসে আছে। ভাবলাম, আমরা দু-একজন আড্ডা দিয়ে আসলে ভালো কিছু হতে পারে। পরিকল্পনা ছিল যে, গতকাল আমি যাব, আর আজ-কাল আরেকজন যাবে। প্রায়ই পাগল দুটোকে যখন বিদায় দিয়ে বাসে তুলে দেই, তখন মনে হয়, দুম করে বাসে উঠে ময়মনসিংহ চলে যেতে পারলে মন্দ হত না। কে জানে, সেকারণেই গতকাল বাসে চড়ে বসতে এত বেশি ভালো লেগেছিল কিনা! এবং ময়মনসিংহ নেমেও কেন যেন বড় ভালো লাগলো। অটোতে করে নিজেই শহরের রাস্তাগুলো খুঁজতে গিয়ে পুরো শহরটাকে হঠাৎ করেই খুব বেশি আপন মনে হল—যতখানি আগে কখনই হয়নি। এবং ঠিক সেই মুহূর্তেই, অটোতে বসে ঠিক করলাম যে, রিয়াকে ফোন দিয়ে বলবো, খুব খিদে পেয়েছে, যেন দুপুরে একটু খেতে দেয়! টাউন হলে এসে নেমে পড়লাম। শীতের দুপুরে মোড়টা দেখতে বড় সুন্দর লাগছিল। ওপাশে একটা হলদে রঙের দোতলা বাড়ি আছে—সেটার গায়ে যখন রোদ পড়ে—মুগ্ধ হয়ে দেখতে হয়। আমি কলেজের পাশের রাস্তাটা ধরে হাঁটতে হাঁটতে রিয়াকে ফোন দিলাম। গাধাটা রীতিমত কানফাটানো একটা চেঁচানি দিল, ‘আল্লাহ, ভাইয়া ...

এলোকথন (মৃগশিরা ২৪:১)

ছবি
শীতটুকু নামেমাত্র হলেও, এইসব শীতের রাতে আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে। আমি ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারি না, কারণ কাক-না-ডাকা ভোরে উঠে যখন কাক-ডাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে আমাকে একটা দিন পার করতে হয়, এবং এরপর আরামবাগের বিপরীতে প্রচণ্ড চায়ের তৃষ্ণা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, এবং এরও পর, আমাকে যথাক্রমে ও বিপরীতক্রমে হাঁটতে ও দাঁড়াতে হয়—তখন আমি ব্যাখ্যা করতে পারি না—কেন এইসব শীতের রাতে (কিংবা সন্ধ্যায়) আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে। ভাগ্যে তিনি ছিলেন। নয়তো হয়তো জোর গলায় এটুকুও বলতে পারতাম না যে, আমার হৃদয়ে মৃত্যু আসে। বড়জোর ‘ক্যাঙ্কা লাগতিসে গে বা’ বলেই থেমে যেতে হত, কিংবা আরেকটু স্পষ্ট করে বললে—আমাকে থমকে যেতে হত, প্রচণ্ড শক্তিতে নিজেকে প্রকাশ করার চেষ্টা করতাম, আমি চিৎকার করতে চাইতাম, এবং শেষপর্যন্ত, ‘ক্যাঙ্কা জানি লাগতিসে’-তে এসেই থমকে যেতাম। এই মৃত্যুর কারণ কি কেবল এই যে, আমরা ক্লান্তিটুকু, আমাদের বিষণ্নতাটুকু রাখার জন্য একটা ছায়া খুঁজে বেড়াই? কিংবা, ছায়ার আশ্রয়টুকুতে আসার ঠিক পরমুহূর্তেই কি এক ধরনের বিষণ্নতাবোধ আমাদের আক্রান্ত করে? আমাদের ক্লান্ত, ক্লান্ত করে? আমি ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারি না, কা...

চেঁচামেচি দিবস

ছবি
অনেক অনেককাল আগে, একটা সুন্দর দিন ছিল। যেদিন কিছু হয়নি। যেদিন কেউ জানত না যে, দিনটা সুন্দর ছিল। অথচ দিনটা সুন্দর ছিল। অনেক অনেককাল আগে, এক বিকেলে আমি বসে ছিলাম। এমনিই বসে ছিলাম। সেই বিকেলে কিছু হয়নি। কিছু যে হয়নি তার প্রমাণ, সেই বিকেলের কথা কেউ জানে না। অসংখ্য শব্দেভর্তি আমার ডায়েরিটাও তার খোঁজ জানে না। বিকেলটা সুন্দর ছিল। আজ থেকে অন্তত এক কোটি বছর আগে, অচেনা নম্বর থেকে একটা ফোন এসেছিল। এমনিই ফোন এসেছিল, কোন কারণ ছিল না। কারণ যে ছিল না তার প্রমাণ, সেই যদি ফোন আমি না ধরতাম, তবে গোটা জীবনে দ্বিতীয়বার আর সেই ফোন আসত না। তাতে কিছু এসে যেত না, কারণ আমি কখনই জানতে পারতাম না সেই ফোনের কথা—যেটা জীবনে একবার আসে। কিছু এসে যেত না বটে। যেই মানুষটা সারাটা জীবন একটা অন্ধকার ঘরে কাটিয়ে দেয়, সে নিশ্চয়ই আলোর অভাবে হাঁসফাঁস করে মরবে না? সুতরাং, স্পষ্টতই আমি বেঁচে থাকতাম। জোর গলায় ঘোষণা দিতাম, আমি পৃথিবীর স্পর্শ চিনি। এবং প্রাণভরে শব্দগুলো শুনতাম। বলতাম, they slither while they pass, they slip away across the universe. অথচ আমি জানতে পারতাম না—ইউনিভার্স দেখা আমার বাকিই রয়ে গে...

অন্তর্গত বিস্ময় – ২

ছবি
“God is a concept—by which we measure our pain.” কথাটা জন লেনন বলেছিলেন, কোন এক গানে। থুড়ি, ঠিক ‘কোন এক গানে’ বলাটাও ঠিক হচ্ছে না, কারণ এটা যথেষ্ট বিখ্যাত একটা গান। সত্যি বলতে কী, এই গানের কথা যে আমি কতবার করে মানুষজনকে বলেছি, বলতে বলতে নিজেই আশ্চর্য হয়ে গেছি—কতবার এমন হয়েছে—আমি নিজেও জানি না। এবং ঠিক এই কথাটাই আমার লেখার কথা সপ্তাহদুয়েক আগে। আবারও রিয়ার বকা খেয়ে লিখতে বসলাম—এদ্দিন বাদে। ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত, কারণ যুক্তি বলে, রিয়ার বকায় কাজ হওয়ার কথা না। বিশেষ করে, নভেম্বরের এই ভুতুড়ে রাতে কোনক্রমেই হওয়ার কথা না। তবে কিনা, যুক্তির উপরে আরও কিছু একটা বাস করে, কাজেই যখন লিখতে বসার কথা না—ঠিক তখনই আমার মনে হয়, ঠিক সেই মুহূর্তেই আমার মনে পড়ে আরিফের অমর উক্তি—‘দামি লেখা পড়তে গেলে আমি নিশ্চয়ই পাবলিক লাইব্রেরিতেই যেতাম? আপনার কাছে সস্তা লেখাই পড়তে চাইসি, সুতরাং প্লিজ, লেখেন।’ আমি যে একেবারেই লিখছি না—ব্যাপারটা এমনও না। বছরের মাঝখানে ডায়েরি লেখা প্রায় ছেড়ে দিয়েও এই বছর প্রায় বিয়াল্লিশ হাজার শব্দের ডায়েরি লিখে ফেলেছি, ডিসেম্বর শেষ হতে হতে বোধকরি তা পঞ্চাশে গিয়েই ঠেকবে—এটাই...

অন্তর্গত বিস্ময় – ১

ছবি
এক. হতে পারে, নভেম্বরের এই সময়টা মানুষের মধ্যে খানিকটা হলেও সাইকিডেলিয়া এনে দেয়। অবশ্য, ‘সাইকিডেলিয়া’ শব্দটা বলা বোধহয় ঠিক হচ্ছে না, এটা অর্থ অনেকভাবেই করা যায়। এর চেয়ে অনুভূতিটাকে ‘পরাবাস্তব’ ডাকলেই বরং ভালো শোনায়। হেমন্তকাল না এটা? হেমন্তে যেই রহস্যময়তা আছে, এবং যেই রহস্যটুকু আছে হেমন্তকে পুনর্জন্ম দেয়া কবির ভেতরে—সেই রহস্য সম্ভবত আর কোথাও নেই। আমি মাঝেমধ্যেই ভাবি, জীবনানন্দ যদি এভাবে হেমন্তকে নতুন করে জন্ম দিয়ে না যেতেন, আমরা কীভাবে নিজেদেরকে ব্যাখ্যা করতাম? একটা ফর্সা চাদর, ফর্সা বিছানা, জানালার পাশের টেবিলটায় বসে, ঠিক রাত আটটায় দ্বাদশীর আলো দেখে যেই অনুভূতিটা হত—সেটার কারণ আমরা কীভাবে খুঁজে পেতাম? আমার ধারণা, আমরা বিভ্রান্ত হয়ে যেতাম, স্ট্যাটের মাঠে দিশেহারা হয়ে বসে থাকতাম, আমাদের হাত-পা কাঁপতে থাকত, আরও একবার মহাখালী থেকে বাসে উঠতে গিয়ে আমরা কেবল শূন্যতাই দেখতাম (অর্থাৎ ঢেউটুকু দেখতাম না)। এবং তিনি ছিলেন। তিনি ছিলেন, তাঁর ট্রাঙ্কটুকু ছিল—বড় সৌভাগ্য আমাদের—হেমন্তের মধ্যিখানে এসে আমরা আবিষ্কার করতে পারি যে, “জানি—তবু জানি নারীর হৃদয়—প্রেম—শি...